চতুর্থ অধ্যায়
শক্তিশালী রাজনৈতিক দল ব্যবস্থা ব্যতীত গণতন্ত্র ও সুফল পায় নাঃ
আধুনিক যুগ গণতন্ত্রের যুগ। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক দল অত্যন্ত গুরুত্ব পূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রাজনৈতিক দল ব্যতীত সংসদীয় ও রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থা পরিচালনা সম্ভব নয়। কারণ দল ব্যতীত নির্বাচন হলে আইন পরিষদের সদস্যদের রাজনৈতিক পরিচয় থাকবে না ফলে তারা হবে সংগঠনহিন এতে তাদের মধ্যে কোন নিয়মানুবর্তিতা থাকবে না। তাদের মধ্যে এক নীতি ও কর্মসূচি থাকবে না। তাছাড়া রাস্ট্রপতির পক্ষে সরকার গঠন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। সরকার গঠিত হলেও আইন পরিষদের তার কোনো সমর্থন থাকবে না। রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থায় অনুরূপ সমস্যা দেখা দেবে। ফলে রাষ্ট্রপতির পক্ষে শাসনকার্য পরিচালনা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এতে সরকার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হবে। প্রফেসর ব্রাইস বলেন, রাজনৈতিক দল বিশৃংখল ভোটারদের ঐক্যবদ্ধ করে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করে। যদিও দল কোন কোন সময় ভুল করে তবুও তারা কোন ক্ষেত্রে জনগণের দুঃখ-কষ্ট নিবারণ করে থাকে ফলে রাজনৈতিক দল অপরিহার্য। প্রতিনিধিত্বশীল সরকার দলব্যতীত কাজ করতে পারে না। গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য উপাদান হল শক্তিশালী রাজনৈতিক দল। শক্তিশালী রাজনৈতিক দল বিশৃংখলা ভোটারদের ঐক্যবদ্ধ করে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করে এবং জনগণের দুঃখ-দুর্দশায় রাজনৈতিক দল এগিয়ে আসে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্থায়িত্ব সংরক্ষণে রাজনৈতিক দল গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করে। শক্তিশালী রাজনৈতিক দল জনমত গঠনে মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকারকে কার্যকর করে তুলে। রাজনৈতিক দল বহুবিধ কার্য সম্পাদন করে থাকে। রাজনৈতিক দলের কার্যাবলী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে জনগণ ও পরোক্ষভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা অংশগ্রহণ করে অর্থাৎ রাজনৈতিক দল জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে। তাই শক্তিশালী রাজনৈতিক দল ব্যবস্থা ছাড়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অকার্যকর হয় পড়ে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের দল ব্যবস্থায় গণতন্ত্রের চর্চাঃ
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক দল হয়ে থাকে বন্ধু শ্রেণী ও স্বার্থের সমন্বয়ে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল ব্যবস্থার গণতন্ত্র চর্চা প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তাই দলগুলো গঠনতন্ত্রে ছায়া থাকুক না কেন বাস্তবে দলের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক নিয়ম নীতি বা বিধি-বিধান যথাযথভাবে অনুসৃত হয়না। বাংলাদেশের দলগুলোর মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা অত্যন্ত নগণ্য এর কারণ হলোঃ
০১। উত্তারধিকার ভিত্তিক নেতৃত্বঃ বাংলাদেশে নেতৃত্বের বিষয়টি লক্ষ্য করলে দেখা যায় এটি মূলত ও তার অধিকার ভিত্তিক নেতৃত্ব। প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক ও বয়োজ্যৈষ্ঠ ভিত্তিক মানা হচ্ছে না।
০২। দলগত প্রবনতাঃ বাংলাদেশের দল ব্যবস্থায় অভ্যন্তরীণ লবিং গ্রুপিং এর মাধ্যমে যদি কোন নেতা তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে উপনীত হতে না পারে। তাহলে সে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে তোয়াক্কা না করে দল ভেঙ্গে চলে যায়। কিংবা অন্য দলের টানে গিয়ে নিজের অবস্থান করে নেয়।
০৩। পারিবারিক ঐতিহ্যঃ বাংলাদেশের দল ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বে পারিবারিক ঐতিহ্য ব্যক্তিগত চরিত্র ইত্যাদি দলে গণতান্ত্রিক পদ্ধতির চেয়েও বেশি অনুসরণ করা হয়। ফলে এখানে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেনি।
০৪। নেতৃত্তের সংকটঃ বাংলাদেশের প্রায় প্রত্যেকটি দলের মধ্যে সন্ত্রাসী পোষণ, দুষ্টের লালন এর সংস্কৃতি বিদ্যমান এখানে কোনো মেধাবীর মূল্যায়ন তেমন হয় না।
০৫। ধর্মের প্রভাবঃ বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব বেশ স্পষ্ট কারন ৮৫% লোক মুসলিম। অন্যদিকে ইসলামি দলগুলোর মধ্যে গঠনতন্ত্রের চর্চা নেই। এর প্রধান কারন হলো ধর্মীয় কুসংস্কারের কারনে গঠনতন্ত্রকে ইসলাম সমর্থন করে না। অনেক ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় নেতারা বিভ্রান্ত করে।
০৬। নিম্ন রাজনৈতিক সংস্কৃতিঃ গনতান্ত্রিক পরিবেশতথা গঠনতন্ত্রের বিকাশের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সংস্কৃতি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দীর্ঘ সামরিক শাসনে প্রভাব থাকার কারনে রাজনৈতিক সংস্কৃতিক বিকাশ ব্যাহত হয়। এর ফলে অরাজনৈতিক দল একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে এর অভ্যন্তরে অরাজনৈতিক দলের মধ্যেও গঠনতন্ত্র চর্চা হয়।
০৭। ক্ষমতা লিন্সাঃ বাংলাদেশের অরাজনৈতির একটি বিশেষ দিক হলো ক্ষমতা লিন্সা। এর ফলে কেন্দ্রীয় নেতারা ক্ষমতাকে আঁকড়ে ধরে। দলে গঠনতন্ত্রের পরিবর্তে স্বৈরতন্ত্রের পথ অবলম্বন করে।
পৃষ্ঠা-১৫
গনতন্ত্রকে সুসংহত করার জন্য আমার করনীয় সমূহঃ
আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে 'গনতন্ত্র' একটি বহুল আলোচিত বিষয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অপরকোন বিষয়কে কেন্দ্র করে এতবেশী আলোচনার ঝড় বা এত বেশী বিভ্রান্তর সৃষ্টি হয়নি। গঠনতন্ত্র কোন নতুন ব্যবস্থা নয়। প্রাচীন কালে গ্রিসে এ ধারনা সৃষ্টি হয়। গঠনতন্ত্রকে সুসংহত করার জন্য নিচে আমার করনীয় সমূহ আলোচনা করা হলোঃ
০১। গণতান্ত্রিক শিক্ষার প্রসারঃ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার জন্য গণতান্ত্রিক শিক্ষার কোন বিকল্প নেই জনগণকে সচেতন করে তোলার মাধ্যমে একটি আদর্শ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। যে জাতি যত উন্নত হবে সে জাতি বা রাষ্ট্র ব্যবস্থায় শক্তিশালী বা সুসংহত হবে।
০২। দেশ প্রেম সৃষ্টিঃ গণতন্ত্রকে সুসংহত করার জন্য জনগণের মধ্যে দেশ প্রেম সৃষ্টি বিশেষ ভূমিকা পালন করে। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় প্রত্যেকে অংশগ্রহণে সমান সুযোগ থাকে। ফলে জনসাধারণের মধ্যে স্বদেশপ্রীতি সৃষ্টি হয়।
০৩। আইনের শাসনঃ গণতন্ত্র আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়। সকল ক্ষেত্রে জনগণই চূড়ান্ত বিচারক। ফলে সকল প্রকার বৈষম্যমূলক আচরণের পথ রুদ্ধ থাকে।
০৪। দায়িত্বশীলতাঃ গণতন্ত্রে শাসিতের কাছে দায়িত্বশীল থাকে। সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় মন্ত্রিপরিষদ জনগণের কাছে দায়ী থাকে। আবার রাষ্ট্রপতি শাসিত শাসন ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি সরাসরি জনগণের কাছে দায়িত্বশীল থাকে।
০৫। রাজনৈতিক শিক্ষাবিস্থারঃ গণতন জনগণের রাজনৈতিক চেতনা ও শিক্ষার বিস্তার ঘটে। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় প্রত্যেককে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। এতে জনগণের রাজনৈতিক শিক্ষার ব্যাপক সুযোগ ঘটে জনগণ রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়।
০৬। সার্বিক কল্যাণঃ গণতন্ত্রই সকল রাজনৈতিক কর্তৃত্ব জনগণের হাতে ন্যস্ত থাকে। লাক্সি বলেন জনকল্যাণ সাধন যদি সরকারের লক্ষ্য হয় তবে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব জনগণের হাতেই থাকা আবশ্যক। তাই গণতন্ত্রে সার্বিক কল্যাণে জন্য সরকারি ক্ষমতা ব্যবহৃত হয়।
০৭। ন্যায় ও সত্যের প্রতিষ্ঠাঃ গণতন্ত্র হলো ন্যায় ভিত্তিক শাসনব্যবস্থার প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। এ ব্যবস্থায় সকলের সাথে মতামতের আদান-প্রদানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় বলে সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয় এবং সাম্য ও স্বাধীনতার সংরক্ষিত হয়।
০৮। স্বায়ত্তশাসন এর সুবিধাঃ স্বায়ত্তশাসনের মাধ্যমে জনগণের মানসিক উন্নতি সাধন সম্ভব। আর গণতন্ত্রের স্বায়ত্তশাসনের অবাধ সুযোগ রয়েছে। জনগণ শাসনকার্যে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়।
০৯। ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠাঃ গণতন্ত্র হলো ন্যায় নীতি ভিত্তিক শাসন ব্যবস্থার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বার্কার মতে," গণতন্ত্রের ন্যায় ও সত্যের প্রতিষ্ঠা সম্ভব। রাজনৈতিক সত্যের উপলব্ধির জন্য পারস্পারিক আলাপ আলোচনা এবং ভাব বিনিময় এর প্রয়োজন”।
১০। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধঃ গণতন্ত্রকে সুসংহত করার জন্য গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ একান্ত আবশ্যক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ছাড়া গণতন্ত্র কে প্রতিষ্ঠা করা যায় না। রাষ্ট্রের নাগরিকদের প্রত্যেকের মধ্যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার মাধ্যমে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা যায়।
পৃষ্ঠা-১৬
Post a Comment